আজঃ মঙ্গলবার ০৭-০৭-২০২৬ ইং || খ্রিষ্টাব্দ

মুমিনের লক্ষ্য হওয়া উচিত ভারসাম্যপূর্ণ জীবন

  • আপডেটেড: সোমবার ০৬ জুলাই ২০২৬
  • / পঠিত : ৪ বার

মুমিনের লক্ষ্য হওয়া উচিত ভারসাম্যপূর্ণ জীবন

দুনিয়ার চাকচিক্য, সম্পদ আর আরাম-আয়েশ মানুষকে সহজেই আকৃষ্ট করে। কিন্তু এই আকর্ষণের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে বড় পরীক্ষা- মানুষ কি তার প্রবৃত্তির দাস হবে, নাকি আত্মসংযম ও আল্লাহভীতির মাধ্যমে নিজেকে উন্নত করবে? তাই আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে মানুষের একটি ভয়াবহ পরিণতির কথা স্মরণ করিয়ে দেন, যখন মানুষ ইবাদত থেকে দূরে সরে যায় এবং নিজেদের খেয়ালখুশির অনুসারী হয়ে পড়ে। তিনি বলেন, ‘অতঃপর তাদের পরে মন্দ লোকেরা আগমন করল। তারা নামাজ নষ্ট করল এবং কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ করল। সুতরাং তারা অচিরেই পথভ্রষ্টতা প্রত্যক্ষ করবে। কিন্তু তারা ছাড়া, যারা তওবা করেছে, ঈমান এনেছে। সুতরাং তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তাদের ওপর কোনো জুলুম করা হবে না।’ -সূরা মারিয়াম: ৫৯-৬০

এই আয়াত আমাদের সতর্ক করে যে নামাজ পরিত্যাগ করা ও প্রবৃত্তির অনুসরণ করা মানুষকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়। তবে একই সঙ্গে আশার বার্তাও দেয়- তওবা ও ঈমানের মাধ্যমে ফিরে আসার দরজা সর্বদা খোলা। এরপর আল্লাহতায়ালা দুনিয়ার মোহে পড়া মানুষের মানসিকতা তুলে ধরেন কারুনের ঘটনার মাধ্যমে। তিনি বলেন, ‘অতঃপর (কারুন) জাঁকজমক সহকারে তার সম্প্রদায়ের সামনে বের হলো। যারা পার্থিব জীবন কামনা করত, তারা বলল, হায়! কারুন যা প্রাপ্ত হয়েছে, আমাদের যদি তা দেওয়া হতো! নিশ্চয়ই সে বড় ভাগ্যবান। কিন্তু যারা জ্ঞানপ্রাপ্ত হয়েছিল, তারা বলল, তোমাদের জন্য ধিক্কার! যারা ঈমানদার এবং সৎকর্মশীল, তাদের জন্য আল্লাহর দেওয়া সওয়াবই উত্কৃষ্ট। এটা তারাই পায়, যারা সবরকারী।’ -সূরা কাসাস: ৮০

এই আয়াত শেখায়- দুনিয়ার বাহ্যিক জৌলুস দেখে মুগ্ধ না হয়ে জ্ঞানী ও ধৈর্যশীলদের মতো আখেরাতের স্থায়ী সফলতার দিকে দৃষ্টি রাখা উচিত। কেননা মানুষ প্রায়ই নেয়ামতের ভোগে মত্ত হয় এবং ভুলে যায় যে একদিন তাকে সবকিছুর হিসাব দিতে হবে। তাই আল্লাহতায়ালা সেই কঠিন মুহূর্ত স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, ‘এরপর অবশ্যই সেদিন তোমরা নেয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।’ -সূরা তাকাসুর: ৮

এই আয়াত আমাদের জীবনের প্রতিটি ভোগ-বিলাস, প্রতিটি সুযোগ-সুবিধার জন্য জবাবদিহির কথা মনে করিয়ে দেয় এবং আমাদের সচেতন ও দায়িত্বশীল হতে উদ্বুদ্ধ করে। আবার যারা শুধু দুনিয়াকেই লক্ষ্য বানিয়ে নেয়, তাদের পরিণতি সম্পর্কেও আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘যারা ইহকাল কামনা করে, আমি সেসব লোককে যা ইচ্ছা দ্রুত দিয়ে দিই। তারপর তাদের জন্য জাহান্নাম নির্ধারণ করি। তাতে তারা তিরস্কৃত অবস্থায় প্রবেশ করবে।’ -সূরা বনি ইসরাঈল: ১৮

ক্ষণস্থায়ী দুনিয়া মুমিনের জন্য ভোগ্যবস্তু নয়। কিন্তু শয়তান একজন মুমিন বান্দাকে ভোগ্যবস্তুর সৌন্দর্য দিয়ে বিমোহিত করে আখেরাত থেকে গাফেল রাখার চেষ্টা করে। সে কারণেই দুনিয়ার স্বরূপ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ‘মানুষের জন্য শোভনীয় করা হয়েছে তাদের আসক্তিসমূহকে তাদের স্ত্রী ও সন্তানদের প্রতি, স্বর্ণ ও রৌপ্যের রাশিকৃত সঞ্চয়সমূহের প্রতি, চিহ্নিত অশ্বরাজি, গবাদি পশু ও শস্যক্ষেতের প্রতি। এসব পার্থিব জীবনের ভোগ্যবস্তু মাত্র। আর আল্লাহর কাছেই আছে সুন্দরতম ঠিকানা।’ -সূরা আলে-ইমরান: ১৪

আখেরাতের তুলনায় দুনিয়ার জীবন একজন মুমিনের কাছে খুবই তুচ্ছ ও নগণ্য। কেননা আল্লাহ বলেন, ‘তুমি বলো, দুনিয়ার সম্পদ তুচ্ছ। আর আখেরাতই হলো মুত্তাকিদের জন্য উত্তম।’ -সূরা আন নিসা: ৭৭

তিনি আরো বলেন, ‘তোমরা কি আখেরাতের বিনিময়ে দুনিয়াবি জীবনের ওপর সন্তুষ্ট হয়ে গেলে? অথচ আখেরাতের তুলনায় দুনিয়ার ভোগবিলাস অতি নগণ্য।’ -সূরা তওবা: ৩৮

দুনিয়ার জীবন ক্রীড়া-কৌতুকের বস্তু। এই ভোগ্যবস্তুর মোহে পড়ে মুমিন যেন ধোঁকায় পতিত না হয়, সে জন্য মহান আল্লাহ দুনিয়া ও আখেরাতের তুলনা বর্ণনা করে বলেন, ‘পার্থিব জীবন ক্রীড়া-কৌতুক ছাড়া কিছু নয়, আখেরাতের জীবনই প্রকৃত জীবন। তারা যদি জানত!’ -সূরা আনকাবুত: ৬৪

দুনিয়ার সফলতা সাময়িক, কিন্তু আখেরাতের শাস্তি চিরস্থায়ী। তাই মুমিনের লক্ষ্য হওয়া উচিত ভারসাম্যপূর্ণ জীবন, যেখানে দুনিয়া আখেরাতের জন্য প্রস্তুতির মাধ্যম। কোরআনের এই নির্দেশনার বাস্তব প্রতিচ্ছবি আমরা দেখতে পাই নবী কারিম (সা.)-এর জীবনে।

হজরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করে বলেন, ‘নবীজির পরিবার কখনো ধারাবাহিকভাবে দুদিন জবের রুটি খেয়ে তৃপ্ত হতে পারেননি।’ -সহিহ বোখারি: ৫৪১৬

এভাবে নবী কারিম (সা.)-এর জীবনের দীর্ঘ সময়জুড়ে অভাব থাকা সত্ত্বেও তিনি কখনো অভিযোগ করেননি; বরং ধৈর্য ও কৃতজ্ঞতার মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি অবিচল ছিলেন। কেননা প্রাচুর্য নয়, বরং তৃপ্তিই প্রকৃত সুখের উৎস। হজরত আয়েশা (রা.) আরো বর্ণনা করেন, তিনি উরওয়া (রহ.)-কে বলেন, ‘কখনো কখনো দুই মাসে তিনবার নতুন চাঁদ দেখা যেত, অথচ নবীজির ঘরে আগুন জ্বলত না। আমরা খেজুর ও পানি দিয়ে দিন কাটাতাম।’ -সহিহ মুসলিম: ৭৪৪৯

অতএব, আমাদের উচিত নবী কারিম (সা.)-এর জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে সংযমী, পরিমিত ও আল্লাহমুখী জীবন গড়ে তোলা। দুনিয়ার মোহে নয়, বরং আখেরাতের সফলতাকেই জীবনের মূল লক্ষ্য বানানো। কেননা দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী আর আখেরাত চিরস্থায়ী।

 

ট্যাগস :


নিউজ কমেন্ট করার জন্য প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে লগইন করুন

Copyright © 2025. All right reserved OnlinePress24
Theme Developed BY Global Seba