আজঃ বুধবার ০৪-০২-২০২৬ ইং || খ্রিষ্টাব্দ

স্মৃতির দর্পণে মুফতি ওয়াক্কাস (রহ.) মাওলানা মুহাম্মদ আবদুর রহীম ইসলামাবাদী

  • আপডেটেড: বৃহস্পতিবার ১৩ Nov ২০২৫
  • / পঠিত : ১৯২ বার

স্মৃতির দর্পণে মুফতি ওয়াক্কাস (রহ.) মাওলানা মুহাম্মদ আবদুর রহীম ইসলামাবাদী

মুফতি মুহাম্মদ ওয়াক্কাস (রহ.) বাংলাদেশের অন্যতম রাজনীতিবিদ, আলেম, শায়খুল হাদিস ও মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা মুহতামিম। তিন বার নির্বাচিত জাতীয় সংসদ সদস্য, প্রতিমন্ত্রী ও জাতীয় সংসদের হুইফ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ছিলেন জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের সভাপতি, ইসলামি আইন বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি, বাংলাদেশ কওমি মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড বেফাকুল মাদারিস আরবিয়া বাংলাদেশের সহসভাপতি, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের নায়েবে আমির এবং কারা নির্যাতিত মজলুম জননেতা।

মুফতি মুহাম্মদ ওয়াক্কাস (রহ.)-এর জন্ম ১৯৪৮ সালের ১৫ জানুয়ারি। তিনি ১৯৫৮ সালে প্রাইমারি শিক্ষা সমাপ্ত করেন। ১৯৬৫ সালে দাখিল, ১৯৬৭ সালে আলিম এবং ১৯৬৯ সালে যশোর মনিরামপুর লাউড়ি আলিয়া মাদ্রাসা থেকে অত্যন্ত কৃতিত্বের সঙ্গে ফাজিল পাস করেন। ১৯৭১ সালে তিনি মাদারিপুর শরিয়তীয়া আলিয়া মাদ্রাসা থেকে প্রথম শ্রেণিতে কামিল পাস করেন। সেখানে তার বুখারি শরিফের শিক্ষক ছিলেন আল্লামা মুহিব্বুর রহমান (রহ.)। তিনি আল্লামা জাকারিয়া (রহ.)-এর বিখ্যাত শাগরেদ ছিলেন।

কামিল পাসের পর তিনি মনিরামপুর কলেজে জেনারেল শিক্ষা লাভ করেন। তিনি তার ওস্তাদ ও মুর্শিদের নির্দেশে দ্বিতীয়বার হাদিসের টাইটেল ও ফতোয়া বিষয়ে শিক্ষা লাভের উদ্দেশে ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দ গমন করেন। ১৯৭৪ সালে দারুল উলুম দেওবন্দ থেকে দ্বিতীয়বার দাওরায়ে হাদিস, ১৯৭৫ সালে তাকমিলে দ্বীনিয়াত এবং ১৯৭৬ সালে ফিকাহ ও ফতোয়া বিষয়ে উচ্চতর শিক্ষা সমাপন করে সনদ লাভ করেন। ১৯৭৬ সালে দেশে ফিরে এসে প্রথমে যশোর মনিরামপুর লাউড়ি আলিয়া মাদ্রাসায় শিক্ষকতা শুরু করেন। ১৯৭৮ সালে খুলনা দারুল উলুম মাদ্রাসায় মুহাদ্দিস হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৮০ সালে শায়খুল হাদিস আল্লামা মুহিব্বুর রহমান (রহ.)-এর ইন্তেকালের পর তিনি ওই মাদ্রাসার শায়খুল হাদিস নিযুক্ত হন। তিনি যশোর মনিরামপুর মাদানি নগর জামেয়া এমদাদিয়া মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা মুহতামিম, প্রধান মুফতি এবং শায়খুল হাদিস ছিলেন। ঢাকার পূর্ব রামপুরার জামিয়া আরাবিয়া দারুল উলুম নতুনবাগ মাদ্রাসার শায়খুল হাদিসও ছিলেন তিনি। ঢাকায় থাকলে তিনি সেখানে বুখারি শরিফের সবক পড়াতেন। মুফতি মুহাম্মদ ওয়াক্কাস (রহ.) ১৯৭৩ সালে শায়খুল ইসলাম আল্লামা সৈয়দ হুসাইন আহমদ মাদানি (রহ.)-এর বিশেষ খলিফা ও তার ওস্তাদ লাউড়ি আলিয়া মাদ্রাসার সাবেক প্রিন্সিপাল আল্লামা শায়খ তাজাম্মুল আলী জালালাবাদী (রহ.)-এর হাতে বাইয়াত গ্রহণ করেন। ১৯৮৪ সালে চিশতিয়া, কাদেরিয়া, নকশবন্দিয়া ও সোহরাওয়ার্দীয়া তরিকায় খেলাফত লাভ করেন।

মুফতি মুহাম্মদ ওয়াক্কাস (রহ.) ১৯৮৬ সালে এলাকার জনগণের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। অতঃপর ধর্ম মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নিযুক্ত হন। মুফতি মুহাম্মদ ওয়াক্কাস (রহ.) জাতীয় সংসদের হুইপ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ১৯৮৮ সালে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে দ্বিতীয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি ২০০১ সালে চারদলীয় জোট মনোনীত জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের প্রার্থী হিসেবে তৃতীয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এমপি, প্রতিমন্ত্রী ও হুইপ হিসেবে তিনি এলাকার উন্নয়ন এবং দেশ, জাতি ও ইসলামের খেদমত করার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালান। মুফতি মুহাম্মদ ওয়াক্কাস তার পীর আল্লামা তাজাম্মুল আলী (রহ.)-এর অনুমোদনক্রমে আল্লামা হাফেজ আবদুল করিম শায়েখে কৌড়িয়া, আল্লামা মুহিউদ্দীন খান, আল্লামা শামছুদ্দীন কাসেমী, আল্লামা শওকত আলী (রহ.) প্রমুখের বিশেষ অনুরোধে ১৯৯১ সালে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের জেনারেল সেক্রেটারির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে তিনি জমিয়তকে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। সুদীর্ঘ ২৫ বছর তিনি জেনারেল সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। অতঃপর ৭ নভেম্বর ২০১৫ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় কাউন্সিলে সর্বসম্মতিক্রমে তিনি জমিয়তের নির্বাহী সভাপতি নির্বাচিত হন। ১১ জানুয়ারি ২০১৮ সালে ঢাকা প্রেস ক্লাবে অনুষ্ঠিত কাউন্সিল অধিবেশনে তিনি জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের সভাপতি নির্বাচিত হন। তিনি ইসলামি ঐক্যজোটের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, যুগ্ম মহাসচিব ও মহাসচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। একজন দক্ষ ইসলামি চিন্তাবিদ, রাজনীতিবিদ, সমাজসেবক, শায়খুল হাদিস, মুফতি ও মুহতামিম হিসেবে তিনি ব্যাপকভাবে পরিচিত।

মুফতি মুহাম্মদ ওয়াক্কাস (রহ.) ১৯৮৭ সালে সংসদ সদস্য হিসেবে এবং ১৯৮৮ সালে ধর্ম প্রতিমন্ত্রী থাকাকালে দলনেতা হিসেবে হজপালন করেন। তখন সৌদি সরকারের পক্ষ থেকে তাকে বায়তুল্লাহ শরিফের মহামূল্যবান গিলাফ উপহার দেওয়া হয় এবং তিনি পবিত্র কাবা ঘরে প্রবেশ করে নফল নামাজ আদায়ের সুযোগ পান। এরপর তিনি আরও অনেকবার হজ ও ওমরাহ পালন করেছেন। রাষ্ট্রীয় কাজে সৌদি আরব, ইরাক, লিবিয়া ও মৌরিতানিয়া সফর করেছেন। এ ছাড়া ব্রিটেন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ভারত ও পাকিস্তান সফর করেছেন।

মুফতি মুহাম্মদ ওয়াক্কাস (রহ.) ‘শরিয়তের আলোকে মুসলিম পারিবারিক আইন’ ও ‘ইসলামি আইন বনাম প্রচলিত আইন’ নামে গুরুত্বপূর্ণ দুটি বই রচনা করেন।

২০২১ সালের ৩১ মার্চ লাখো ভক্ত, শাগরেদ এবং রাজনৈতিক অনুসারীদের এতিম করে তিনি ইন্তেকাল করেন। তার প্রতিষ্ঠিত যশোর মনিরামপুর জামিয়া মাদানিয়া মাদ্রাসায় তার জানাজার নামাজ পড়া হয় এবং সেখানে তাকে দাফন করা হয়। বাংলাদেশের প্রধান এই রাজনীতিবিদ আলেম, মুফতি, শায়খুল হাদিস ও পীরে কামেল মুফতি মুহাম্মদ ওয়াক্কাস (রহ.)-কে আল্লাহতায়ালা জান্নাতুল ফেরদাউস নসিব করুন। আমিন।



নিউজ কমেন্ট করার জন্য প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে লগইন করুন

Copyright © 2025. All right reserved OnlinePress24
Theme Developed BY Global Seba