আজঃ বুধবার ০৪-০২-২০২৬ ইং || খ্রিষ্টাব্দ

শোকের ছায়া ও ক্ষোভের আগুন: হাদিকে হত্যার প্রতিবাদে উত্তাল রাজপথ

  • আপডেটেড: শুক্রবার ১৯ Dec ২০২৫
  • / পঠিত : ৬৭ বার

শোকের ছায়া ও ক্ষোভের আগুন: হাদিকে হত্যার প্রতিবাদে উত্তাল রাজপথ

ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম সংগঠক শরীফ ওসমান হাদির মৃত্যুতে সারাদেশে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। বৃহস্পতিবার (১৮ ডিসেম্বর) বাংলাদেশ সময় রাত ৯টা ৪৫ মিনিটে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। হাদির মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পরপরই ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী ও বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ছাত্র-জনতা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। বিচার দাবিতে রাজপথে নেমে আসে হাজারো মানুষ, যার ফলে বিভিন্ন স্থানে সড়ক অবরোধ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।গত ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর বিজয়নগরে নির্বাচনী প্রচারণা শেষে ফেরার পথে দুর্বৃত্তদের গুলিতে মাথায় গুরুতর আঘাত পান ঢাকা-৮ আসনের এই সম্ভাব্য সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী। প্রথমে ঢাকা মেডিকেল ও পরে এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসার পর ১৫ ডিসেম্বর তাকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়েছিল। সেখানে অস্ত্রোপচার হলেও শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। হাদির চিকিৎসায় যুক্ত নিউরোসার্জন আব্দুল আহাদ ভিডিও বার্তায় মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

মৃত্যুর খবর ঢাকায় পৌঁছামাত্রই বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল থেকে শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে টিএসসি ও শাহবাগ চত্বরে জড়ো হন। শামসুন্নাহার ও রোকেয়া হলসহ বিভিন্ন নারী হলের শিক্ষার্থীরাও মিছিলে যোগ দেন। রাত পৌনে ১টার দিকে শাহবাগে অবস্থানরত বিক্ষুব্ধ জনতার সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করতে আসেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও সদ্য সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। এ সময় নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘শরীফ ওসমান হাদিকে গুলি করে হত্যা করার মাধ্যমে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। আমরা এই যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত। হাদি ভাইয়ের রক্তের দাম ও দেশের স্বাধীনতা আমরা বৃথা যেতে দেব না।’

একই দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। রাত পৌনে ১২টার দিকে টিএসসি থেকে শুরু হওয়া মিছিলটি ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করে। সমাবেশে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দীন নাসির অভিযোগ করে বলেন, ‘যারা গত ১৭ বছর ধরে গণতন্ত্রকে হত্যা করেছে, তারাই আসন্ন নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র হিসেবে হাদিকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করেছে।’ সংগঠনটির ঢাবি শাখার সভাপতি গণেশ চন্দ্র রায় সাহস হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, হাদির দেখানো পথে ছাত্রদল গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম চালিয়ে যাবে।

বিক্ষোভের একপর্যায়ে রাজধানীর কারওয়ান বাজার এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। রাত ১২টার দিকে বিক্ষুব্ধ জনতা প্রথম আলো কার্যালয়ে ভাঙচুর ও নথিপত্রে অগ্নিসংযোগ করে। এরপর তারা ডেইলি স্টার কার্যালয়ের দিকে অগ্রসর হলে সেনাবাহিনীর সদস্যরা এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। এছাড়া রামপুরা ও মিরপুরসহ নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক অবরোধ করে যান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়।

ঢাকার বাইরে বন্দরনগরী চট্টগ্রামেও বিক্ষোভ সহিংস রূপ নেয়। রাত পৌনে ১১টার দিকে নগরীর দুই নম্বর গেট এলাকা থেকে মিছিল নিয়ে বিক্ষুব্ধ জনতা সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের চশমা হিলের বাসভবনে হামলা চালায়। এ সময় তারা বাসার সামনে থাকা একটি মোটরসাইকেলে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং বাসভবনের ভেতরে ঢুকে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। পুলিশ জানিয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তারা কাজ করছে। এছাড়া ফটিকছড়িতেও সড়ক অবরোধ করে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করা হয়।

শোকের ছায়া নেমে এসেছে হাদির গ্রামের বাড়ি ঝালকাঠির নলছিটিতে। মৃত্যুর খবর পেয়ে আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। বিচার দাবিতে বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১১টা থেকে ঝালকাঠি শহরের কলেজ মোড় এলাকায় ঢাকা-ঝালকাঠি মহাসড়ক অবরোধ করে ‘ব্লকেড’ কর্মসূচি পালন করেন স্থানীয় জনতা ও এনসিপি নেতাকর্মীরা। এতে মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

সিলেটের চৌহাট্টা বিজয় চত্বরে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করেছেন স্থানীয় ছাত্র-জনতা। ‘দিল্লি না ঢাকা’, ‘হাদি হত্যার বিচার চাই’ স্লোগানে তারা রাজপথ প্রকম্পিত করেন। পটুয়াখালীর চৌরাস্তায় প্রায় ঘণ্টাব্যাপী সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বক্তারা বলেন, ‘ওসমান হাদি চলে গেলেও এদেশে লক্ষ লক্ষ হাদি তৈরি হবে। ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে আমাদের সংগ্রাম থামবে না।’ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েও শিক্ষার্থীরা জোহা চত্বর থেকে মিছিল বের করে শহর প্রদক্ষিণ করেন।

এদিকে, হাদির মৃত্যুতে শুক্রবার (১৯ ডিসেম্বর) জুমার নামাজের পর সারাদেশে বিশেষ দোয়া ও কফিন মিছিলের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে ‘জুলাই ঐক্য’। সংগঠনের কেন্দ্রীয় সংগঠক ইসরাফিল ফরাজী এক বিবৃতিতে দেশবাসীকে এই কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়ে বলেন, শহীদ ওসমান বিন হাদির প্রতি ফোঁটা রক্তের বদলা বাংলাদেশের মাটিতেই নেওয়া হবে।


নিউজ কমেন্ট করার জন্য প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে লগইন করুন

Copyright © 2025. All right reserved OnlinePress24
Theme Developed BY Global Seba