আজঃ বুধবার ০৪-০২-২০২৬ ইং || খ্রিষ্টাব্দ

ভূমিকম্পে ধ্বংস হওয়া এক জাতির ইতিহাস

  • আপডেটেড: মঙ্গলবার ২৫ Nov ২০২৫
  • / পঠিত : ৭৩ বার

ভূমিকম্পে ধ্বংস হওয়া এক জাতির ইতিহাস

শহিদুল ইসলাম কবির

ইতিহাসের পাতা এবং কোরআনে কারিমের আদ্যোপান্ত বিবরণে মানবজাতির সামনে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে বহু জাতির উত্থান-পতনের কথা। এসব ঘটনার উদ্দেশ্য ছিল মানুষকে সঠিক পথের প্রতি আহ্বান এবং অবাধ্যতার পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করা। এমনই একটি জাতি হলো- কওমে সামূদ। যাদেরকে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ভয়াবহ ভূমিকম্প ও প্রচণ্ড ধ্বনির মাধ্যমে ধ্বংস করেছিলেন।


আরব ও সিরিয়ার মধ্যবর্তী অঞ্চলকে তখন হিজর বলা হতো, সে এলাকায় এ জাতি বসবাস করত। তারা খুবই শক্তিশালী ও বীর জাতি ছিল। প্রস্তর খোদাই ও স্থাপত্যবিদ্যায় তারা পারদর্শী ছিল। সমতল ভূমির বিশাল এলাকাজুড়ে অট্টালিকা নির্মাণ ছাড়াও পর্বত খোদাই করে তারা নানা ধরনের প্রকোষ্ঠ নির্মাণ করত।

মহান আল্লাহ তাদের কাছে হজরত সালেহ (আ.)-কে নবী হিসেবে প্রেরণ করেন। তিনি তাদেরকে আল্লাহর একত্ববাদে ডেকে আনলেন, অন্যায়-অবিচার পরিহার করতে বললেন এবং আল্লাহর নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানালেন। কিন্তু এই জাতির অধিকাংশ মানুষ নবীর ডাকে সাড়া না দিয়ে উল্টো তাকে মিথ্যাবাদী বলে অপবাদ দেয়। পবিত্র কোরআনের ৯৯ আয়াতবিশিষ্ট সূরা হিজরে এ বিষয়ে আলোচনা রয়েছে। মক্কায় অবতীর্ণ হওয়া কোরআন কারিমের ১৫তম সূরা এটি। এ সূরায় হিজরবাসীদের কথা আলোচনা হওয়ায় সূরার নাম হিজর রাখা হয়েছে।


হিজাজ ও সিরিয়ার মধ্যস্থলে ‘ওয়াদিউল কুরা’ প্রান্তরে তাদের বসতি ছিল। বর্তমানে তা ‘ফাজ্জুহ নাকাহ’ নামে প্রসিদ্ধ। তারা ছিল অর্থশালী ও শক্তিশালী। তারা বড় বড় প্রাসাদ ও পাহাড় কেটে দালানকোঠা নির্মাণ করত। তাদের ছিল সবুজ-শ্যামল উদ্যান। সোনা-রুপার প্রাচুর্যে মোড়ানো জীবন। কিন্তু তারা এক আল্লাহতে বিশ্বাসী ছিল না। তাদের কাছে নবী হয়ে এলেন হজরত সালেহ (আ.)। তিনি তাদের আল্লাহর পথে ডাকলেন। দুর্বল ও নগণ্য গুটিকয়জন ছাড়া কেউ তার ডাকে সাড়া দিল না। তারা তাদের প্রাসাদ, অর্থবৈভব ও বিলাসসামগ্রী নিয়ে গর্ব-অহংকার করতে লাগল। তারা হজরত সালেহ (আ.)-এর কাছে নবী হওয়ার দলিল চাইল। তারা দাবি করল, আপনি যদি বাস্তবিকই আল্লাহর রাসূল হন, তাহলে আমাদের ‘কাতেবা’ নামের পাথরময় পাহাড়ের ভেতর থেকে একটি ১০ মাসের গর্ভবতী, সবল ও স্বাস্থ্যবতী উষ্ট্রী বের করে দেখান।হজরত সালেহ (আ.) আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করলেন। আল্লাহতায়ালা তার ডাকে সাড়া দিলেন। গর্ভবতী ও দুগ্ধবতী উট বেরিয়ে এল পাথরময় পাহাড় থেকে। এ বিস্ময়কর মোজেজা দেখে কিছু লোক তৎক্ষণাৎ ইমান আনলেও অনেকে বিরত থাকল। এই উট হত্যা করতে তাদের নিষেধ করা হয়েছিল। তারা অবাধ্য হয় এবং উটটি হত্যা করে।

এক শনিবার প্রভাতের সময় গগনবিদারী গর্জন, মুহুর্মুহু বিজলির চমক আর ভয়াবহ ভূমিকম্পে তাদের প্রাণবায়ু বেরিয়ে গেল। তারা নিজ নিজ ঘরে মুখ থুবড়ে পড়ে রইল। পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেল সামুদ জাতি। এ সূরার ৮০ থেকে ৮৪ নম্বর আয়াতে এ ঘটনার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা রয়েছে।

আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে তাদের জন্য একটি স্পষ্ট নিদর্শন প্রদান করা হয় উষ্ট্রী। এটিকে কষ্ট দেওয়া বা হত্যা করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু বিদ্রোহী সম্প্রদায় নবীর সতর্কতা অমান্য করে ওই উষ্ট্রীকে হত্যা করে। এটাই ছিল তাদের বিরুদ্ধে আল্লাহর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নাজিল হওয়ার কারণ।

পবিত্র কোরআনে উল্লেখ আছে, তাদের ওপর নেমে আসে ভয়াবহ ভূমিকম্প (আর-রজফাহ) এবং আকাশবিদারী প্রচণ্ড ধ্বনি (আস-সাইহাহ)। মুহূর্তের মধ্যেই তারা ধ্বংস হয়ে যায় এবং তাদের বিলাসী জনপদ এক ভয়াল নিস্তব্ধতায় পরিণত হয়। কোরআনে কারিমের বিভিন্ন আয়াতে এ ঘটনার বিস্তারিত উঠে এসেছে- ‘অতঃপর তাদেরকে ভূমিকম্প গ্রাস করল, ফলে তারা তাদের ঘরে উপুড় হয়ে পড়ে রইল।’ -সূরা আল আরাফ: ৭৮

আরও ইরশাদ হয়েছে, ‘ভয়াবহ শব্দ তাদেরকে গ্রাস করল, তারা তাদের ঘরে মুখ থুবড়ে পড়ে রইল।’ -সূরা হুদ: ৬৭

কওমে সামূদের এই পরিণতি মানবইতিহাসে সতর্কবার্তা হিসেবে চিরস্মরণীয়। উন্নয়ন, শক্তি কিংবা সম্পদ কাউকে রক্ষা করতে পারে না, যদি ন্যায়-নীতি, সত্য এবং আল্লাহর নির্দেশনার প্রতি শ্রদ্ধা হারিয়ে যায়।

আজকের পৃথিবীতেও ভূমিকম্পসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ আমাদের মনে করিয়ে দেয়- মানুষ যত শক্তিশালীই হোক, আল্লাহর ইচ্ছার কাছে সে সর্বদাই অসহায়। কওমে সামূদের ঘটনা তাই শুধু একটি ঐতিহাসিক দলিল নয়; বরং মানুষের জন্য নৈতিক ও আধ্যাত্মিক শিক্ষা।

সাম্প্রতিক সময়ে গত কয়েকদিনে ব্যবধানে ৪টি ভূমিকম্পের ঘটনা আমাদেরকে সতর্ক করিয়ে দিয়েছে। তাই আমাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হচ্ছে মহান আল্লাহর হুকুম-আহকাম মেনে চলতে হবে এবং রাসূলে কারিম (সা.)-এর দেখানো পথে বাকি জীবন পরিচালনা করতে আবারো অঙ্গীকারবদ্ধ হতে হবে। অতীতের গুনাহের থেকে পরিত্রাণ পেতে অধিক পরিমাণে তওবা-ইস্তেগফার পড়ার অভ্যাস করতে হবে।

লেখক: সম্পাদক, মাসিক মদীনার পয়গাম

ট্যাগস :


নিউজ কমেন্ট করার জন্য প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে লগইন করুন

Copyright © 2025. All right reserved OnlinePress24
Theme Developed BY Global Seba